বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন
মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে যুব সমাজকে বাঁচাতে আমাদের করণীয়
খবর প্রতিদিন প্রতিবেদন ঃবর্তমান সময়ে মাদকাসক্তি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা। বিশেষ করে তরুণ ও যুব সমাজের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনই ধ্বংস করে না, বরং পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করা আজ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
ঢাকা মহানগর উত্তর সেচ্ছাসেবক দল উত্তরা পশ্চিম থানার সদস্য সচিব মোঃ হানিফ আরো বলেন।
উদ্বেগজনক বাস্তবতা
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক গ্রহণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে। সহজলভ্যতা, কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অবক্ষয় মাদকাসক্তির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বর্তমানে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, আইস (মেথামফেটামিন), বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং মাদকমিশ্রিত অন্যান্য দ্রব্য তরুণদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। মাদকাসক্তি মানুষের মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। পাশাপাশি শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
মাদকের সামাজিক প্রভাব
মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তি ধীরে ধীরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা, সড়ক দুর্ঘটনা, পারিবারিক নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের সঙ্গে মাদকাসক্তির সম্পর্ক পাওয়া যায়। ফলে সমাজে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়।
যুব সমাজ কেন ঝুঁকিতে?
বন্ধুদের নেতিবাচক প্রভাব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অসুস্থ বিনোদনের প্রভাব।
বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা।
পারিবারিক অবহেলা ও যোগাযোগের অভাব।
মাদকের সহজলভ্যতা ও অপর্যাপ্ত নজরদারি।
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাব।
মাদক প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
পরিবারের ভূমিকা: সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের মানসিক পরিবর্তন, বন্ধু নির্বাচন এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী আলোচনা, সেমিনার, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
সমাজের দায়িত্ব: ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
আইন প্রয়োগ: মাদক উৎপাদন, পাচার ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
যুবকদের ইতিবাচক সম্পৃক্ততা: খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা, প্রযুক্তি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এতে তারা সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকবে এবং মাদকের প্রতি আকর্ষণ কমবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মানসম্মত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
উপসংহার
যুব সমাজ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্র। তাই মাদকমুক্ত যুব সমাজ গড়ে তোলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে আমাদের যুব সমাজকে রক্ষা করতে পারি। একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও স্বপ্নময় প্রজন্মই পারে আগামী বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে।